ক্যানভাস ১৮ বাই ২৪ / তবে এই গল্পের শেষ আছে !

Set your life on fire. Seek those who fan your flames. - Rumi


চারুর ঘুম ভাঙলো মাথার ভেতর একগাদা যন্ত্রণা নিয়ে । মাত্র দেখা জঘন্য একটা স্বপ্নের রেশ লেগে আছে। ভায়োলিনের বিষন্ন সুর তার কানে বাজছে । রুমের লাইটটা অফ করা । আধো আলো আর আধো অন্ধকারে ঢাকা। মশারির হাজারটা ছিদ্র দিয়ে সে সাদা সিলিঙ এর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো । রাতের ব্যাপারটা আবার ভেসে আসছে । লজ্জার বিষয় । কেউ জেনে গেলে কি যা তা যে বলবে । কিন্তু ভারি মজাও যে লাগে। কি মুস্কিল । তবে এটা সত্য এতটা লাই দেয়া উচিত হয় নি । লাই দিয়ে দিয়ে এই মানুষগুলোর গাছের আগায় উঠেছে । যা তা বলছে । যা তা চাইছে । ভাগ্যিস এই সব অনলাইনে থাকছে । চাইলেই ব্লক করে দেয়া যাবে । আপাতত দেখা যাক কতদিন ধরে এদের তেলবাজি চলতে পারে । 


চারু বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করলো । চার্জের কোটা তিন শতাংশে দেখাচ্ছে । অনেকগুলো ম্যাসেজ জমা হয়ে আছে । অর্গানাইজেশন এর ছ্যাচড়াটা লিখেছে । সাথে নির্ঘাত একটা অসভ্য ম্যাসেজ । একটা পাঠিয়েছে ফালতু ছেলেটা । সারাদিন কেমন গেল জানতে চাচ্ছে । আরেকটা পাঠিয়েছে অনুপম । পাঠচক্রের পরবর্তী তারিখ নিয়ে । আরেকটা পাঠিয়েছে সিনিয়র ভাই । সেটা চুল টুল আঁচরে পড়তে হবে । এখন মশারি উঠাতে হবে । বিছানা গুছাতে হবে । ফ্রেশ হয়ে ভাত খেতে হবে । চারু মোবাইলটা চার্জে দিয়ে গামছা আর কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো। 


চারুর বিছানার পাশে টেবিলটা আকাশী কাঠের । মেসে আছে আজ ৫ বছর । এই নিয়ে দুবার পায়া ভেঙেছে। মেসের মালিক পাশের ফার্নিচার দোকান থেকে সারিয়েছেন । আত্মীয় হয়েও দাম কেন রাখলো এই নিয়ে তার আক্ষেপের শেষ নেই । চারু এই কথা অনেকবার শুনেছে । দেখা হলেই পথ আটকে দাঁড়ায় । কথা বলার সময় বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে । চারুর মন মেজাজ ভালো থাকলে সহ্য করে । খারাপ থাকলে পালিয়ে বাঁচে । টেবিলের উপরে সুই সুতো দিয়ে বুনোন করা টেবিল ক্লথ । এক পাশে গুছিয়ে রেখেছে ফিজিক্সের বই, আরেকপাশে খাতা, প্যাড । মাঝখানের তার বানানো কলমদানিতে বুনন করার সুই, কলম, ব্রাশ রাখা । উপরে কতগুলো গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ । কিছু কেনা, কিছু গিফট, আর কিছু ধার করা । বই এর উপরে একটা ডাইরি রাখা। ডাইরির মাঝখানে কলম দিয়ে বুকমার্ক করা । রাতে অর্ধেক লিখতে বসে উঠে গিয়েছিল । আর লিখা হয়নি । 


বাথরুম থেকে মাথা মুছতে মুছতে যখন বের হলো তখন মোবাইলে ৪০ শতাংশে । ফ্যান ছেড়ে দিয়ে চেয়ার টেনে ফ্যানের নিচে এসে বসলো । চোখ বন্ধ করে মাথাটা চেয়ারের উপর এলিয়ে দিলো । আজকের দিনটা কি করে কাটাবে সেটা ভেবে নিচ্ছে । আজ সোমবার । ক্লাস আছে অনেকের । ক্যাম্পাস এ একটা হাত মৌজা বানানো দিয়ে দিন শুরু করা যায় । হ্যারি পটার এন্ড  প্রিজনার অব এজকাবান এর  অডিওবুক শুনতে শুনতে কাজ করবে । এর মধ্যে কারোর না কারো সাথে দেখা হয়ে যাবে । হাঁটতে বলবে । চা খেতে বলবে । দেখা না হলেও ক্ষতি নেই । রিধিকে কল করে জ্বালানো যাবে। বিকেল এ টিউশনি । সন্ধ্যায় বাইরে একটু হেঁটে চা টা খেয়ে তারপর মেসে ফিরে কোর্স এর পড়া ধরবে। নোট করবে । রাতে খেয়ে মোবাইলটা ধরবে । কাউকে না কাউকে জ্বালাবে । বলতে না বলতে বেজে যাবে তিনটা । ক্লান্তিতে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসবে । খুলবে সেই বারোটায় । জীবনের সাইকেল চলছে । বার ভেদে এই সাইকেলের দিক বদলায় । তবে থামে না । গতি শ্লথ হয় না ।  


“এই…”

ক্যাম্পাসের গেইটের সামনে এসে পেছন থেকে কারোর ডাক শুনলো । পেছনে ফিরতো না যদি না আবার সেই ডাকটা বলতো, “কি খবর, তরুলতা?” । ইশ! দিনটা আজকে অনেক ভালো যাবে । আশ্চর্য এই মানুষের সাথে কথা বললেই মন ভালো হয়ে যায় । এত্ত ফানি!

চারু জিজ্ঞেস করলো, “ক্যাসে হো আপ!” । ইলহাম ভাই তার সেই চিরচেনা হাসিটা দিলো যে হাসি শুনে মেয়েরা ফিদা হতে বাধ্য । চারু মনে মনে বললো, হায়! এছে না দেখো আর মুখে বললো, আপনাদের তো শান্তি । সব অশান্তি আমার মাথায় । আমি কোর্সে ডুবে যাচ্ছি । তোলার কেউ নেই । আ’ম সো হেল্পলেস! 

ইলহাম ভাই বললেন, “কোইন্সিডেন্স দেখলে! আমিও আজকে সকালে উঠে কসম খেয়েছি আজকে আমি একজনকে হেল্প করেই ছাড়বো । আর চারুলতা সামনে পড়ে গেল । তাজ্জাব কি বাত!” চারু ফিক করে হেসে দিলো । বললো, “আসলেই তাজ্জবের ব্যাপার” । ইলহাম ভাই বললো, ক্যাফে তে যাচ্ছ? চারু বললো, জ্বি, আপনিও আসবেন? “আসবো দুটো ক্লাস শেষ করে, বসবে এতক্ষণ?” চারু বললো, “সাহায্যের জন্যে যখন মরিয়া হয়ে আছি তখন বসতে তো হবেই” ইলহাম ভাই বললেন, আহারে! আচ্ছা এসে ট্রিট দিবো নাহয়!” তিনি হন হন করে চলে গেলেন ফ্যাকাল্টির দিকে । চারু সেদিকে তাকিয়ে ভাবলো, এমনি এমনি বুঝি মেয়েরা ফিদা হয়? নিজেকে বুঝালো নারে ভাই, সেসব ভেবে লাভ নেই । 


সে হেঁটে গেল ক্যাফের দিকে ।


(বাকি অংশ লিখছি )