মিনিং অব লাইফ

 

Calvin and Hobbes Comic Strip






                                                              এক 


আজিজুল হক টাওয়ার, ঝাউতলা 


মাশফির মনে হচ্ছে বমি আসবে । পেটটা মোচর দিচ্ছে । মুখের কাছে টক টক লাগছে । আজকে কি প্ল্যানটা ক্যন্সেল করবে? নাহ, অসম্ভব । সে সব দরজা বন্ধ করে এসেছে । পেছানোর উপায় নাই । সতেরো তলা দালানের উপর থেকে মানুষগুলোকে দেখাচ্ছে ছোট্ট সব পোকার মতো । দিকবিদিক তারা ছুটছে । মাশফির আগের জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনার মতোই তারা দেখতে । নতুন ভয় হচ্ছে লাফ দেয়ার পর কারোর মাথার উপর পড়বে না তো?  


মাশফি কার্নিশ এর উপর দাঁড়ালো । দুই হাত দিয়ে দেয়ালটা ধরে রেখেছে । বাতাস এর জোর এত বেশী মনে হচ্ছে ধাক্কা দিয়েই ফেলে দিবে । পড়ার জন্যেই যে আসা । সেটা বাতাসের ধাক্কাতেই হোক আর নিজের মনের ধাক্কাতেই হোক । এই  কি তবে শেষ? ২৪ বছরের জীবন এক লহমায় ইতি ঘটবে?


মাশফি উপরওয়ালার দিকে তাকালো । মুখ দিয়ে নয় মন দিয়ে বললো, অধমকে ক্ষমা করো কোনো কাজে আসতে না পারার জন্যে । উপরওয়ালা তাতে কি মনে করলেন সেটা বুঝার উপায় নেই । নভেম্বর সকালের রোদকে যদি খোদার মনোভাব বলে ধরে নেয়া যায় তবে তিনি খুব একটা খুশি নন। মাশফি এর মধ্যে ঘামতে শুরু করেছে । সেটা রোদের তাপের কারণেও হতে পারে কিংবা পরবর্তি পদক্ষেপ এর কথা ভেবেও হতে পারে । 

  

সে নির্লিপ্তভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো । এতক্ষণ জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছিলো । এখন ধীরে ধীরে নিচ্ছে । ভয়ের কিছু নেই । ভয়ের কিছু নেই । ভয়ের কিছু নেই । যা হওয়ার হয়ে গেছে । সবাই সব কিছু পায় না । সবাই সব কিছু হয় না । আট হাজার কোটি মানুষের মাঝে একজন মাইনাস হলে কিছু যায় আসে না ।  কথাগুলো বারবার বলে নিজেকে শান্তনা দিলো । যেনো মন্ত্র । রাস্তায় মানুষের ভীড়টা কমে এসেছে । যানজট প্রায় নেই । এখনি সময় । মাশফি কার্নিশে রাখা হাতের মুঠ আলগা করছে । শরীরটা সামনে ঝুকে দিয়েছে । চোখটা বুজে রেখেছে । এখনি সপে দেবে নিয়তির কাছে । 


এমন সময় নোটিফিকেশন এর শব্দ তাঁর কানে এলো । বুকটা ধক করে উঠলো । চোখ খুললো। এগিয়ে দেয়া শরীরটা দেয়ালের সাথে লাগিয়ে নিলো। কার্নিশটা আবার শক্ত করে ধরলো । শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটটা জিহ্ববা দিয়ে নতুন করে ভেজালো। বিশেষ মানুষেকে বিদায় বলে মোবাইলটা বন্ধ করে ফ্লোরে রেখেছিল । তবে বন্ধ থাকা মোবাইলে ম্যাসেজ আসে কিভাবে? 


জানার আগ্রহ মাশফির মাঝে প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে । কার্নিশ এর ওপাশ থেকে এপাশে এলো । কি মারাত্মক ভয় যে পেয়েছে সেটা হাত-পা এর কাঁপাকাঁপি থেকে বুঝতে পারছে । চোখটা অকারণে ভিজে আসছে । কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা ফ্লোর থেকে তুললো । মন ইতোমধ্যে একটা ব্যাখা দাঁড় করিয়ে ফেলেছে । হয়তো কাঁপা হাতের কারণে শাটডাউনের বদলে রিস্টার্টে চাপ পড়েছে । হয়তো শেষ যে মানুষটাকে ম্যাসেজ দিয়েছে সে ই হয়তো উদ্বিগ্ন হয়ে এখন রিপ্লাই পাঠিয়েছে? হয়তো । এই ব্যাখ্যা মনের মাঝে যে আশার আলো দেখাচ্ছে সেটা মাশফি একদমই পছন্দ করছে না। ফেলে আসা পথে ফেরত যাওয়ার প্রশ্নই আসে না । 


মাশফি পাওয়ার বাটনে হালকা করে চাপলো । নাহ, অন হচ্ছে না । তাঁর মানে মোবাইলটা বন্ধ। পাওয়ার বাটনে জোরে চাপ দিলো । অপেক্ষা করলো । কিন্তু না । তারপরও আসছে না । ব্যাটারি ডেড হয়তো? সেটাও হতে পারে । তবে নোটিফিকেশনের শব্দ কি ভুল শুনলো? হ্যালুসিনেশন? সে পৃথিবী ছেড়ে যেতে চাইছে কিন্তু তাঁর ভেতরের আরেকটা সে বাস্তবতায় থেকে যেতে চাইছে? সে যেটা শুনতে চাইছে সেটাই তাঁকে শোনাচ্ছে? এসব কিছু এড়িয়ে গিয়ে আর সাতপাঁচ না ভেবে কি লাফ দিয়ে দিবে?


এমন সময় তাঁর মোবাইলটা নড়ে উঠলো । মাশফি স্ক্রিনের দিকে তাকালো । অবাক হয়ে পড়লো, “এখনি নয়”। এর অর্থ কি হতে পারে? কি করেই বা সম্ভব? নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে আছে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে । বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার পর্দা যে ছিড়ে গেছে সেটা অনুমান করতে পারছে সে । এখনি নয়? এখন নয় তো কখন? 


মোবাইলটা আবার নড়ে উঠলো । এইবার লিখা “রাস্তায় নামো” । মাশফির মাথাটা কেমন হালকা হালকা লাগছে । ক্ষিদে একটা কারণ হতে পারে । সকাল থেকে না খেয়ে আছে । ভেবেছিল পেট ভর্তি করে লাফ দিলে একটা বিতিকিচ্ছিরি দৃশ্যের অবতারণা হতে পারে । মৃত্যুর পর লজ্জা জিনিসটা নিয়ে ভাবা হাস্যকর তবুও তার মনে হয়েছিল সে সকালে কি খেয়েছে সেটা রাস্তার লোক জেনে গেলে খারাপ হবে । ছাদের ট্যাংকের সাথে থাকা ট্যাপ এর নজেল ঘুড়িয়ে কয়েক ঢোক পানি খেলো । প্রাণ কিছুটা আসতে শুরু করেছে । কিন্তু মাথাটা ঝিম ঝিম করছে । বন্ধ মোবাইল থেকে আসা ম্যাসেজের মাথা-মুন্ড কিছুই বুঝতে পারছে না । বেহাল হয়ে ছাদের মেঝেতে হাত পা ঝেড়ে শুয়ে পড়লো । নভেম্বরের বাতাস গায়ে লাগছে। নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে সশব্দে বললো, “এসবের অর্থ কি?” 


অবচেতন মন বলছে উত্তরটা অতি পরিচিত সত্তা থেকে আসছে । কিন্তু চিন্তাটা সামনে আনতে চাচ্ছে না। কেমন অদ্ভুত শোনায় । সৃষ্টিকর্তা তাঁর সাথে ম্যাসেজে কথা বলছে । মাশফি শব্দ করে হাসলো । শুনতে কেমন পাগলের হাসির মতো শোনালো । কিছুটা আধ্যাত্মিক আধ্যাত্মিক ভাবও মনে এলো । আরেকটা কারণও হতে পারে । এতদিন চারপাশের যেসব অদৃশ্য সত্তাকে অস্বীকার করে আসছে সেসবও হতে পারে। যদি হয়ও তবে তাঁকেই কেন? এমন না যে সে কোনো সুফি স্বভাবের মানুষ । পাপ থেকে দূরে থাকে নি । নামাজ বহুবার কাজা করেছে । প্রেমে পড়েছে । তাঁকে সাহায্য করে কি লাভ?


মাশফি উঠে বসলো । নিচে যেতে বলেছে যখন নিচে গিয়ে দেখা যাক । আসার সময় দারোয়ানকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়ে ছিল । নামার সময় দেখলো মাত্র আড়মোড়া ভাঙছে । তাঁকে নামতে দেখে পিঠ সোজা করলো। বাঁকা চোখে তাকিয়ে রইলো । কিন্তু হইহুল্লোড় করলো না । করলে দায়িত্বে গাফেলতির ঝাড়ি নিজের ঘাড়েই এসে পড়বে । মাশফিও চুপচাপ নেমে এলো।  





                                                             দুই 


ঝাউতলা সড়ক 


রিধি মনমরা হয়ে আছে । যদিও মন ঠিক রাখার সকল উপাদান ওর সাথে । আজকে ওর সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা পড়েছে । ভালো করে চুল আঁচড়েছে । ঠোঁটে হালকা করে লাল লিপিস্টিক মেখেছে (যদিও সে সচরাচর মাখে না) আর পাশে অনুপম কে নিয়ে হাঁটছে । কিন্তু মন খারাপের ব্যাপারটা কিছুতেই যাচ্ছে না। রিধির নিজের উপরই বিরক্ত আসছে । পাশে অনুপম প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে তাঁর মন ঠিক রাখার । ক্লাসমেটের গসিপ, সিনিয়রের গুষ্টি উদ্ধার, কিংবা কোনো ফানি ভিডিওর মিমিকিং কোনোটাই রিধির মুখে হাসি আনছে না (যেটা অন্যসময় নিমিষেই কাজ করে) । অনুপমকে একটা পর্যায়ে জিজ্ঞেস করতেই হলো,

  • কি ব্যাপার? আজকে অন্যরকম যে?

  • এমনি

  • কেমনি?


 সময়টা দুপুর । নভেম্ভরের রোদ তাদের ঝলসে দিতে চাইছে । 

  • আমি তোমাকে মাশফি ছেলেটার কথা বলেছি? 

  • বলেছো

  • কি বলেছি?

  • এই যে সে তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে । সে তো একা না । রিধি নামের দরিয়ায় সিনিয়র জুনিয়র সবাইকেই ডুব দিতে হবে । পাত্তা না দিলেই হয় । কোনো সমস্যা করেছে?

  • এমন ছেলে যে সমস্যা করে আরকি । মরে যাবো টরে যাবো বলে

  • আয়হায় । কখন পাঠালো । বাসার ঠিকানা জানো?

  • আশ্চর্য! ঠিকানা আমি জানবো কি করে?

  • জানলে দেখে আসতাম । পারলে বুঝিয়ে আসতাম ।

  • “বুঝিয়ে” আসতে? রিধি চোখ বড় করলো ।

  • আরে সে বুঝানো না । কথা বলা । ছেলেটাকে তো দোষ দিয়ে লাভ নেই । এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে সবাই যায়। বাস্তবতা বুঝতে কতক্ষণ লাগে?

  • ওহ! আমি ভাবলাম আমি একটা মারামারি দেখবো । ধ্যাত!

  • ভাল্লাগে মারামারি? দেখতে ইচ্ছে করতেছে?

  • হুউউউ

  • সত্যি? আসলেই দেখতে চাও?

মোড়ের দিকে একট্য অটো রিকশা রঙ লাইন দিয়ে আসছিলো । অনুপম গিয়ে “ওই মিয়াঁ” বলে গগন বিদারি হাক দিলো। চালক থতোমতো খেয়ে গেল । অনুপম এর মুখ দিয়ে যাচ্ছেতাই বেরিয়ে এলো । হইহুল্লোড় শুনে লোক জড়ো হয়ে গেলো । এরা কেউ ই কারোর না কারোর উপর বেজার । তাই সকলেই মারমুখো । অন্যের রাগ বেচারা রিকশাওয়ালার উপর ঝাড়ছে । অনুপম ধীরে ধীরে ভীড় থেকে বেরিয়ে এলো । ভাবখানা এই যেন কিছুই হয়নি । এসে হাসিমুখে রিধির সামনে দাঁড়ালো । রিধি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো । একটা মানুষের হাসি কত সুন্দর হতে পারে!


  • ভাল্লাগছে? অনুপম জানতে চাইলো 

  • নাহ! একটুও লাগে নাই । 


রিধি মুচকি হাসলো । অনুপম মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো । কত সুন্দর করে হাসতে জানে মেয়েটা!


                                                          তিন 


মাশফি রাস্তায় পা রাখার সাথে সাথে তাঁর বন্ধ মোবাইলে ম্যাসেজ এলো । এইবার লিখা “চোখ বন্ধ করে রাস্তা পার হও । তারপর চোখ খুলে বলো, “মানিয়েছে” । সে বুঝলো যে ই ম্যাসেজ পাঠাক না কেনো তাঁকে মারার ফন্দিতেই এইসব করছে । কিন্ত সে হাল ছেড়ে দেয়া পথিক । দালানের উপর থেকে পড়ে মরুক কি চোখ বন্ধ অবস্থায় কোনো গাড়ির ধাক্কাতে । সময় মতো মরণ হলেই হলো । সে আশে-পাশে তাকালো । রাস্তায় বেশ মানুষ । উপর থেকে এতটা মনে হয় নি । কেউবা বেকারীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে । কেউবা দোকানের সামনে আড্ডা দিচ্ছে। গাড়ির আনাগোনাও কম না । যাচ্ছেও অনেক দ্রুত । কিন্ত সমস্যা হলো এগুলো বেশির ভাগ হয় রিকশা না হয় সিএনজি । দুই একটা মাইক্রোবাস যাচ্ছে । তবে এদের যে গতি আঘাতে বড়জোর হাত-পা ভাঙ্গবে । মাশফি ভাবলো জীবনের বড় একটা অংশ টেনশান করে কাটিয়েছে । এই শেষ সময়ে এসে আর চিন্তা করার মানে হয় না । যা থাকে কপালে বলে সে চোখ বন্ধ করলো । আর রাস্তা পাড় হতে লাগলো । 


                                               *


অনুপম বললো, এইবার মুড ঠিক হয়েছে ?

রিধি বললো, সমস্যাটা না যাওয়ার আগ পর্যন্ত মুড ঠিক হবে না 

অনুপম বললো, যা আসেই নি তা যাবে কিভাবে? তুমি তার সাথে কথা বলো না । দেখা করো না । দেখবে মাশফি নামের ভূত গায়েব হয়ে গেছে । 

রিধি ভ্রু উচু করে বললো, এতই সহজ? 

অনুপম ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, কঠিন কোথায়? একজন পুরুষ আত্মমর্যাদা জিনিসটা বেশিদিন ইগ্নোর করে থাকতে পারে না । হয়তো এতদিন তোমার চেহারা দেখে সয়ে এসেছে । 

রিধি অন্যদিকে তাকিয়ে বললো, কি আর এমন চেহারা

অনুপম বেশ কাছে এসে বললো, আহা কি চেহারা

রিধি অনুপমের চোখে চোখ রাখলো । মনে হচ্ছে এই চুমু খাবে ।


এমন সময় তাদের কানে এলো, “মানিয়েছে” । রিধি আর অনুপম থতমত খেলো । শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে রিধি ভ্যাবাচ্যাকা খেলো । অজানতেই অনুপম থেকে কিছুটা সরে এলো। একই শহরে থাকে । কোনো না কোনো কারণে আসা যাওয়া প্রত্যহ হচ্ছে । হঠাত দেখা হওয়া অবাক করার বিষয় নয় । কিন্তু রিধি তবু অবাক হলো মাশফিকে দেখে । 


মাশফিও কম অবাক হয় নি । রিধিকে শেষ ম্যাসেজ পাঠিয়ে ধরে নিয়েছিল তার চেহারাটা আর দেখতে হবে না। যদিও চেহারাটা মনে ভেসে এসেছিল বার বার । কিন্তু এভাবে দেখা হবে আসা করে নি । অন্তত অনুপমের সামনে তো নয় ই । মাশফি জানে রিধির চারপাশে মৌমাছির মত মানুষের আনাগোনা । কিন্তু তবুও এড়িয়ে গিয়েছে এই সবকিছু । কাউকে জানতে দেয়নি তার অনুভূতির কথা (যদিও লোকে তার চেহারা খোলা বই এর মত পড়ে ফেলেছে) কিন্তু শেষ-মেষ চোখটা খুলতেই হলো । 


তাদের মাঝখানে অনুপম । সে বুঝতে পারছে কেমন অবস্থার মধ্যে আছে দুজনে। সে রিধির আরও কাছে এসে মাশফির দিকে হেসে বললো, “কিরে মাশফি, এখানে কি করিস?” মাশফি অল্প কথার মানুষ। সাধারণ অবস্থায় ই সে কথা বলে না । এমন অবস্থায় থ মেরে থাকা স্বাভাবিক। কি বলবে বুঝতে পারছে না । তার মুখের সমস্ত থুতু মরুভুমির পানির মত শুকিয়ে গেছে । অনুপম জিজ্ঞেস করলো,  কাকে মানিয়েছে? মাশফি খেয়াল করলো অনুপম আর রিধির মাঝের গ্যাপটা এই একটুখানি । দু জনের হাত এতো কাছে যে মনে হয় এখনি আংগুল গুলো চুমু খাবে একটা আরেকটার সাথে । মাশফির মুখ দিয়ে যে শব্দগুলো বের হলে সেগুলো যেনো নিজের না । কেউ একজন আলকেমি দিয়ে বানিয়ে ঠোঁট থেকে ঠেসে বের করছে, “তোদের খুব মানিয়েছে” । চোখে চোখ রেখে কথা সে বলতে পারে নি । বলতে হয়েছে তাদের পায়ের দিকে তাকিয়ে । বলেই তাদের পাশ কাটিয়ে হনহন করে হেঁটে যেতে হয়েছে । কথাগুলোর মাঝে যেন একটা ঝাঁজ ছিল । চোখ জ্বালা শুরু করে দিয়েছে। 


রিধি আর অনুপম প্রায় দৌড়ে যাওয়া মাশফির ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইলো । রিধি শুনলো অনুপম তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে, এইবার সমাধান হয়েছে । 

 

                                                            চার


ছাতা মসজিদ মোড়, ঝাউতলা


জুনায়েদের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে মীর আর ইসমাইল বসে আছে । তারা অপেক্ষা করছে আব্দুল গফুর নামের এক ব্যাক্তির । কল করে কোথায় আছেন জিজ্ঞেস করলেই বলে এই আসছি কিন্তু তার আসার আর নাম নেই । সেটা নিয়ে দু বন্ধুর মাথা ব্যাথাও নেই । তাদের অপেক্ষা করার কথা তারা অপেক্ষা করছে । জুনায়েদ মাত্র দোকান খুলেছে । তাদের জন্যে চায়ের লিকার বসিয়েছে । দোকানের পাশে একটা প্লাস্টিক টবে একটা ফুল গাছ রেখেছে । ফুল নেই, পাতা নেই । শরীর নুয়ে পড়ে আছে । জুনায়েদ আধ কাপ পানি ঢাললো তাতে । বললো, এই বেটি আর মনমরা থাকিস না । মুখ তোল । সামনে বসা সুন্দর করে লোকটা ফুলের দিকে তাকিয়েছিল । হঠাত করে চোখাচোখি হয়ে গেল । সে লজ্জা পেয়ে একটা হাসি দিলো । মাথা হেট করে আবার দুধ নাড়তে লাগলো । 


মীর জুনায়েদের হাসি খেয়াল করে নি । সে তাকিয়ে ছিল শুকনো গাছের দিকে । দেখে মনে হবে সে প্লেটোর মাপের কোনো চিন্তা ভাবনা করছে । কিন্তু আসলে তার মাথা এখন একদম ফাঁকা । পরিবার, আত্মীয়, চাকরী, বন্ধুবান্ধব, আর ভালোবাসার ব্যাপারে এত এত ভেবে এতটা কুপোকাত হয়েছে যে এখন মনে হচ্ছে সে রেস লাইনের শেষ সীমায় চলে এসেছে । এই রেসে জয় পরাজয় নেই । শুধু দৌড়ানো ছাড়া । শুকনো এই গাছের মতো তার পিঠও বাঁকা । তমা কত করে বলতো পিঠ সোজা করে বসো কিন্তু সে পিঠ সোজা করে কোনদিন বসতে শিখেনি । তমা কোথায় আছে এখন? ভালো আছে নিশ্চয় । ভালো কোনো যায়গায় । সুন্দর কারো সাথে । 


ইসমাইল এর মন ভালো নেই । গতরাতের ক্ষত এখনো মুখে হাতে পায়ে লেগে আছে । ২৭টা ব্যণ্ডেজ লেগে আছে সারা গায়ে । তবে গায়ে যত না লেগেছে, মনে লেগেছে তার চেয়ে বেশি। মানুষগুলো এত মূর্খ হয়! এখনো মানুষ চিনতে শিখলো না । আচ্ছা ঠিকাছে মানা যায় তার নাহয় এখানে ভুল আছে । এত রাত করে পার্সেলটা নিয়ে উচিত হয়নি । পরদিন দিনের বেলায় ডেলিভারি দেয়া যেত । রাতের আধারে লাঠি-সাঠি নিয়ে যেভাবে গুন্ডা মস্তানের মত গোলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা দেখে যে কেউ নিজের জানের ভয়ে দৌড়াতো । সে তো আর জড়বস্তু না । তার প্রাণ আছে । প্রাণের মায়া আছে । সেই মায়ায় দৌড় দিয়েছে । তাই বলে রাস্তায় ডাকাত ডাকাত বলে হুইহই রইরই করে তেড়ে আসতে হবে?


শহরের উন্নয়নও মাশাআল্লাহ এমন করেছে রাস্তার স্ট্রিট লাইটের বাতি ছিল সব বন্ধ । উন্নয়ন দেখে ফর্সা চাঁদ সেদিন মুখ লুকিয়ে ছিল । সেই অন্ধকারে পথের ভুলে সে গিয়ে পড়লো নর্দমায় । সেসব আর ভাবার আর মানে হয় না । এখন ভাবার বিষয় লোকটার ব্যাপার । কি যেন নাম? গফুর । আবদুল গফুর। কোনোদিন চেহারা দেখেনি । শুধু শুনেছে জমিরের কাছ থেকে । লোকটা নাকি চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবে । অনেক টাকা সেলারি । জীবন পালটে যাবে । যেটা তাদের দুজনের ই দরকার । 


মীর ইসমাইলের দিকে হঠাত করে একটা প্রশ্ন করে বসলো,

  • “আচ্ছা বিয়ে শাদি করে লাভটা কি বল তো?”

ইসমাইল মীরের দিকে আহতভাবে তাকিয়ে রইলো । মুখে হাতে এত ব্যান্ডেজ দেখার পরও একবারও জিজ্ঞেস করলো না ব্যাথা কিভাবে পেয়েছে । উলটো উদ্ভট প্রশ্ন করছে । তাও এমন চেহারা নিয়ে যা দেখে মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে । 


সে ভাবলো উত্তর দিবে না পরে কি মনে করে বললো, 

  • “বংশরক্ষার জন্যে, ভালোবাসা প্রিজার্ভ করার জন্যে, লোনলিনেস চিরতরে দূর করার জন্যে । আরও কারণ লাগবে?”

  • “বিয়ে করলেই ভালোবাসা বেঁচে থাকে এ কথা কে বললো তোকে?” 

  • “এক্সেপশন তো আছেই” । 

মীর কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো, 

  • “প্রেম, বিয়ে, বাচ্চা জিনিসগুলোই আসলে এক্সেপশনালদের জন্যে । এমন এক্সপেনসিভ একটা ব্যাপার মামুলি মানুষ সামলাতে পারে না” । 

  • “এক্সপেন্সটাই দেখলি? কমন সেন্স ও যে লাগে । রিচদের দেখ । ‘লিভ নো এক্সপেন্স’ এর রুলে বাচ্চা বড় করায় । কমনদের থেকে এত আলাদা ভাবে চলে যে সেন্সটাই হারিয়ে ফেলে। এই সেন্স এর অভাবেই এদের অনেকে তো পরিবার থেকে ছিটকেও পড়ে, তাই না?” ইসমাইল তার স্বভাবসুলভ হাত নাড়িয়ে কথা বলছে ।  

  • তা পড়ে । তবে ওদের জানালার দিকে তাকিয়ে তো আমাদের শিক্ষা নেয়া যাবে না । 

  • নেয়ার ই বা কি দরকার! 

  • “কোনো দরকার নেই!” মীর বললো, তারপর আরেকটা প্রশ্ন তুললো, “কিন্তু এক্সপেন্স উঠাতে পারলেই কি বাচ্চা জন্ম দেয়া উচিত?” 

  • “অন্যের কথা জানি না তবে আমি উঠাতে পারলেও এই দুনিয়ায় আমার বাচ্চা আনবো না” ।  ইসমাইল মাটির দিকে তাকিয়ে বললো কথাটা

  • “কেন?” 

  • “দাসপ্রথা উঠে গেছে কথাটা আসলে বোগাস । ক্যাপিটালিজমের মোড়কে ঠিকই এই প্রথা বহাল তবিয়তে চলছে। বাচ্চা এলে দেখতেও হবে আমার মতো । এই চেহারা নিয়ে শুধু খেটেই মরতে হবে । তোর কথা আলাদা” ।  

  • “শালা গায়ের চামড়া দেখে ই বিচার করবি?” মীর সহজে রাগে না । এইবার রাগলো

  • “শুধু রঙ দেখে সুন্দর বিচার করছি না । দিনশেষে ফিজিওগনমিরই জয় জয়কার । সুন্দর এর চাইতে বড় ক্রাইটেরিয়া দুনিয়াতে হয় না । রিসেপশনে সুন্দর কেউ বসবে, কল সেন্টারে সুন্দর ভয়েসের কাউকে নিবে, প্রেজেন্টেশনে স্যার পাঁচটা নাম্বার বাড়তি দিবে শাড়ির ফাকে ফর্সা কোমর দেখে। এমনটা ই হয়ে আসছে, এমনটা ই হচ্ছে, এমনটাই হবে ।    


মীর গলদটা ধরিয়ে দিতে যাবে এমন সময় দেখলো একটা ছেলে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে সে বড় রকম ধাক্কা খেয়েছে । চোখটা ভেজা । 





                                                                      পাঁচ


“ইট ডাজেন্ট ম্যাটার” 


মাশফি হাঁটছে ঠিকই তবে দিশা হারিয়ে ফেলেছে । তার পায়ে যেন মোটর লাগানো । একবার চালু হয়েছে যখন চলছেই। কোনদিকে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সে প্রশ্ন তোলা যেন অর্থহীন। শার্টের আস্তিন দিয়ে একটু পর পর চোখ মুছতে হচ্ছে । এমন না যে সে ব্যাপারটা আগে থেকে ভাবে নি । শুরু থেকেই ভেবে এসেছে । কথা বলার আগে, কথা বলার সময়, আর রাতে শুয়ে শুয়ে । ব্যাপারটা ভুল হচ্ছে । কথা বলা ঠিক হচ্ছে না । কোথায় যেন অঙ্ক মিলছে না । কিন্তু তবু সে কথা বলে গেছে রিধির সাথে । 


“আই ডোন্ট কনসিডার…”


কেন? মানুষ হয়ে জন্মালেই সঙ্গী একটা অপরিহার্য দেখে? পুরুষ, সে যে ধর্মেরই হোক, নারী ধর্মের উপরই যেন তার ঈমান বলীয়ান । নাস্তিক হওয়া কি এতই অসম্ভব এখানে?  তবে নিউটন, ভিঞ্চি, জেইন অস্টিন, ইবনে তাইমিয়া এরা পারলেন কি করে?  


“…সামওয়ান লাইক ইউ…”


আমার মতো মানুষ পারবে নাতো কে পারবে? ভাবলো মাশফি । এমন না যে চয়েস আছে। সব গোলমাল পাকিয়েছে একটা তুচ্ছ স্বপ্ন । এই স্বপ্নের পোকা যদি মাথায় না আসতো তাহলে মাশফি এতটা পেরেশান হতো না । এটাকে ভবিষ্যৎ এর ইঙ্গিত ভাবতে গিয়ে ই যত দোষ । যদি মাশফি জানতো আজকাল সব পুরুষই দেখা হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই স্বপ্নযোগে জেনে যায় কোন মেয়ের সাথে তারা কথা বলবে! কত্ত মামুলি একটা ব্যাপার!


“...আ ফ্রেন্ড!”  


রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মাশফির দিকে অনেকেই কৌতহলী দৃষ্টি দিচ্ছে । নওজোয়ান একটা ছেলের গালে চোখের পানি বড় বেমানান । সেটা অন্দরমহলেই হোক কিংবা বাহির। কিন্ত সে সেটা জানলে তো । সে জানে না ভালোবাসা লুকোচুরি খেলা ছাড়া কিছুই না। সেই খেলায় আগে বাড়িয়ে বলা মানেই মাটি । তাই মাশফিকে এখন কাঁদায় গড়াগড়ি খেতে হচ্ছে ।  


“ইদার লিভ লাইক আ হ্যাপি সোল অর ডাই!”


তার শেষ কথাগুলো গুলো মাথায় জিকির করছে । এই জিকির বন্ধ হবে কবে? 

 

                                                                     *


মাশফি একটা চায়ের দোকানের সামনে চলে এসেছে । দোকানের সামনে একটা পাতাহীন শুকনো গাছ রাখা । দোকানে কেক, বিস্কুট ঝুলছে । মাশফির খিদে জেগে উঠেছে । এমন সময় তার বন্ধ মোবাইলে ম্যাসেজ এলো, “বলোঃ উনি আজ আসবেন না” । উনি কে, কেন আসবেন না এইসব মাথায় আসলেও এখন সেসব বোঝা ছেড়ে দিয়েছে সে । যেভাবে চলছে চলুক । আর কিছু যায় আসে না । সে চোখ বন্ধ করে ঠিক কাউকে উদ্দেশ্য না করেই বললো স্বশব্দে বললো কথাটা । 

                                                             

                                                                      *

মীর অদ্ভুত চোখে ছেলেটার দিকে চেয়ে ছিল । যেভাবে হেঁটে আসছিল মনে হচ্ছিল একুল -অকুল সব হারিয়ে এসেছে । তাদের সামনে এসে হঠাত দাঁড়িয়ে যাওয়াতে অবাক হলো। দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দৃষ্টি বিস্কুটের দিকে । ঠোঁট দেখে মনে হচ্ছে কয়েকদিন মরুভূমিতে হেঁটে পার করেছে । এক ফোঁটা পানি গলা দিয়ে নামেনি । মীর দোকানে ঝুলতে থাকা বিস্কুটের পলিথিন থেকে দুটো নিয়ে হাতে দিবে এমন সময় তাঁকে বলতে শুনলো, “তিনি আসবেন না”। মীর ভাবলো, আচ্ছা, তাহলে একে পাঠিয়েছে খবর দিতে । ইসমাইল শুনেই রেগে গেল। 

  • “আসবেনা মানে? এতক্ষণ বসিয়ে রাখার মানে কি তাহলে? বেকার বলে কি সময় নষ্ট করবে?” 

ছেলেটা ইসমাইলের দিকে তাকালো না পর্যন্ত । মীরের থেকে বিস্কুট নিয়ে খেতে লাগলো । ছেলেটার খিদে দেখে মীর আরও দুটো বিস্কুট হাতে দিল । জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢাললো । তার মায়া লাগছে । 


মীরের কাজ দেখে ইসমাইলের রাগ লাগছে । আশ্চর্য! ব্যাটা তোর রাগ টাগ বলে কি কিছুই নেই ? একটা মানুষ চাকরীর কথা বলে বসিয়ে রাখলো । সে তো নিজে এলোই না উলটো আরেকটা ছেলে পাঠালো । নবীর মতো এসে বললো তিনি আসবেন না । মামা বাড়ির আবদার? উলটো বিস্কুট খাওয়ানো হচ্ছে । সে বিস্কুটের টাকাটা কে দেবে শুনি? 


বিস্কুট পানি খেয়ে কিছুটা হলেও প্রাণ এসেছে মাশফির শরীরে । তাঁকে বিস্কুট দেয়া লোকটার দিকে তাকালো । চোখের ইশারায় বললো, ধন্যবাদ । লোকটি চোখের ইশারা বুঝে কিনা সেটা নিশ্চিত না করেই সে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো । পেছনের দ্বিতীয় লোকটা হয়তো কিছু বলছে তবে তার জানার ইচ্ছে নেই । সে হাঁটছে । গন্তব্যহীন ভাবে । 

 

                                                          ছয়


শহীদ খাজা নিজামুদ্দীন সড়ক


নয় বছরের তাজাল্লির আইসক্রিম খেতে মন চাচ্ছে । সে এখন রিকশায় করে মায়ের সাথে বাসায় যাচ্ছে । স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রত্যেকবারই তার কিছু না কিছু খেতে মন চায় । সাথে বাবা থাকলে বায়না করা যেত । বাবা বারণ করে না তবে অসুখের চৌদ্দ গুষ্টির বিবরণে বলে যেতে থাকে । এটা খেলে এই হবে ওটা খেলে ওই হবে । তাজাল্লির চেহারা দেখে যদি মনে হয় সে খেয়ে অনেক মজা পাচ্ছে তখন বাবাও তার  সাথে যোগ দিয়ে ফেলে । কিন্তু আম্মু থাকলে অন্য ব্যাপার । মুড যদি একটু ভালো থাকে তো ঘ্যান ঘ্যান করলে রাজি হয়ে যায় আর মুড খারাপ থাকলে চুপচাপ চলে আসতে হয় বাসায় । এখন আম্মুর মুড একটুও ভালো না ।


কারোর সাথে রাগারাগি নিশ্চয় হয়েছে । এখন আইসক্রিম এর কথা তুললে  চড় একটা বসিয়ে দেবে গালে । এ সপ্তাহটা তার জন্য চড় সপ্তাহ টাইপ যাচ্ছে । প্রতিদিন একটা করে খেতে হচ্ছে। চা খাওয়ার পর কাপটা কেন ধোওয়া হয়নি । দিল এক চড় । খাবার খেতে গিয়ে চিংড়ি বাছলো কেন, তার জন্য চড় । ছোট ভাই কে গালি কেন শেখাচ্ছে তার জন্যে চড় । তবে তাজাল্লি কাঁদে না । রুমে বসে জলরঙ এ আঙ্গুল চুবিয়ে কাগজের উপর ধরে রাখে । লাল, নীল, হলুদ, আর কালো রঙ আঙুল বেয়ে সাদা কাগজে এসে পড়ে ছড়িয়ে যায় । দেখে মনে হবে এবস্ট্রাক্ট কিছু করছে । মন খারাপ তাতে যায় না তবে কিছুটা কমে। তার আইসক্রিম খাওয়ার ইচ্ছা আরও বেড়ে গেল যখন দেখলো আরেকটা মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোন আইসক্রিমে কামড় বসাচ্ছে । মেয়েটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে স্বর্গের মান্না-সালওয়ার জাত খাবার পেয়েছে । তাজাল্লি ঠোঁট কামড়ালো । 


                                                                   সাত 



নীলাচল টাওয়ার ১০ তলার একটা বহুতল ভবন । নীচতলায় দোকানপাট । দো তলায় এবিসি কোচিং সেন্টার । আর তিন তলা আবাসিক । টাওয়ারের নিচে বেশ কিছু মানুছের জটলা । আশ-পাশ দিয়ে যারা হেঁটে যাচ্ছে তারাও কৌতহলের বশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । পাশে থাকা কাউকে জিজ্ঞেস করছে, “কি হয়েছে?” 


উত্তরে কেউ একজন এই নিয়ে বিশবারের মত বললো, সুইসাইড । কে করেছে? তিন তলার আবাবিল ফার্মেসীর মালিক হোসেন সাহেবের ছেলে আরিফ। কিভাবে করেছে? ফ্যানের সাথে দড়ি ঝুলিয়ে । কেন করেছে? এই প্রশ্নে এসে সবাই আটকে যায় । সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারে না । উত্তর ছাড়া থাকাও যায় না । তখন কথার নানান ডালা-পালা গজাতে থাকে । কেউ বলছে হোসেন সাহেবের ছেলে কিঞ্চিৎ পাগল কিসিমের ছিল, অন্য কেউ বলছে পাগল না চাকরী ছাড়া অনেক দিন ঘরে বসে আছে । হেন কোন ব্যবসা ছিল না যে করে নি কিন্ত কিছুই কপালে লাগে নি । আবার কেউবা বলছে, ওসব কিছু না সব মেয়ে ঘটিত ব্যাপার । 


মাশফি ভীড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে এসবই শুনলো । ফিসফিস করে বললো, ভাগ্যবান ছেলে। এমন সময় মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠলো । স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো লিখা আছে, “বলোঃ হ্যা” । মাশফি ভ্রু কুচকালো । কাকে হ্যা  বলবে? কোন প্রশ্নের উত্তর এটা?  এমন সময় তার পাশে একটা বাইসাইকেল এসে দাঁড়ালো । ফুডপানডার রাইডার, আরোহী যুবা। মাশফির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, আপনি কি আরিফ? 


মাশফি ভাবলো না বলবে । খাবার অর্ডার এর টাকা তার হাতে নেই । হ্যা বললে ফেসে যাবে । ঠোঁটটা দিয়ে না শব্দ বের হতে গিয়েও তার মুখ দিয়ে হ্যা বের হয়ে গেল । রাইডার মাশফির হাতে শফিং ব্যাগ ধরিয়ে দিল । তার ছবি তুললো । তারপর চলে গেল । টাকা চাইলোই না । সে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে রইলো । এখন কি করবে? পোলাও বিরিয়ানি বা ফার্স্টফুড কিছু একটা হবে। খিদে ভীষণ পেয়েছে । সে ব্যাগটার নিচে হাত বুলালো । ঠান্ডা। তাহলে তার অনুমান ভুল। ব্যাগটা নাড়ালো । নাকের কাছে নিয়ে শুকলো । নাহ গন্ধ পাচ্ছে না । খুলে দেখবে? নাহ, এখানে না । মন সায় দিচ্ছে না । 


সে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো । 


                                                                আট 


আবিদ মিয়াঁ সড়ক


তানজিনার মন বেশ কয়েকদিন ধরে ভালো নেই । তার বোন পারভীন তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে । কথায় কথায় জায়গা জমির কথা উঠেছিল । গত সপ্তাহে ছোট বোন বাসায় এলে তানজিনা বলেছিল বাবা এক শতক জায়গা তাঁকে বেশি দিয়েছে । পারভীন ব্যাপারটা শুনে মুখ কালো করে ফেললো । বাবা কাউকে না জানিয়ে এমন কাজ কি করে করতে পারলেন? সেদিনই বাসা থেকে চলে গেল দুপুরের খাবার না খেয়েই । অথচ সে বোনের প্রিয় চিংড়ি রেধেছিল । মোবাইল করে বার বার বুঝিয়েছে সে জানতো না বাবা এমনটা করবে । কিন্তু পারভীন শুনতেই চাইলো না । নাম্বার ব্লক করে দিল । তানজিনারও রাগ হলো । ছোটবেলা থেকেই এমন । বুঝতেই চায় না । পুরো সপ্তাহটাই কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল। বড় মেয়েটাকে শুধু চড় থাপ্পড় মেরেছে । তারজন্যেও তার অনুশোচনার কমতি নেই । রিকশাটা পারভীনের বাসার মোড়ে কাছে আসতেই কেন যেন তানজিনার বলে উঠলো, “চাচা, দাঁড়ান এখানে” । 


তাজাল্লি মায়ের দিকে তাকালো । দাঁড়াতে বললো যে? পারু আন্টির সাথে কথা বলবে অবশেষে? সে মনে মনে প্রার্থনা করলো আম্মুর সাথে যেন আন্টির মিল-মিশ হয়ে যায়। গিয়ে যদি আরেক দফা ঝগড়া বাঁধে তবে পরের সপ্তাহটাও চড় খেয়ে কাটাতে হবে । আম্মু তাঁকে রিকশায় বসতে বলে গেটের ভেতরে চলে গেলেন । সে আন্টির বাসার বারান্দার দিকে তাকালো । চার বছরের জিয়াদ বানরের মতো গ্রিল ধরে ঝুলছে । তাজাল্লি হাত নাড়িয়ে হাই দিলো । জিয়াদ তার দিকে তাকিয়ে একটা গগন বিদারী চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, “উইইইচ!!!”


মাশফি চিৎকার শুনে আঁতকে উঠলো । প্যাকেট থেকে সদ্য বের করা কোন আইসক্রিমটা হাত থেকে পড়ে গেল । শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে দেখলো গ্রিল ধরে একটা পিচ্চি ঝুলছে ।  কিন্ত উইচ বললো কাকে? বারান্দার নিচে একটা রিকশায় স্কুলের পোশাক পড়া একটা মেয়ে বসে আছে । বারান্দার ছেলের দিকে তাকিয়ে থাপ্পড় দেয়ার ইঙ্গিত করছে । পিচ্চি উপর থেকে ভেংচি কাটছে । ওয়াক থু ওয়াক থু বলে থুতু দেয়ার ভয় দেখাচ্ছে । আশে পাশে এই লজ্জার বিষয়টা দেখছে কিনা দেখতে গিয়ে তাজাল্লি এদিক সেদিক তাকালো । তখন মাশফির হাতের দিকে তার চোখ গেল । 


মাশফি মেয়েটার চোখের নিবদ্ধ দৃষ্টি অনুসরণ করে যখন দেখলো সেটা হাতে থাকা আইসক্রিম কোনের উপর পড়েছে তখন বুঝলো এই কপালে আইসক্রিম নেই । সে এগিয়ে গিয়ে আইসক্রিমটা মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল । 


তাজাল্লি বুঝতে পারছে না কি করবে । অপরিচিতের কাছ থেকে খাবার নেয়াটা মোটেই ভালো হবে না । কিন্ত অনেক সাধের আইসক্রিমটাও খেতে ইচ্ছে করছে । কি করবে এখন? 



                                                                        —

সাজেস্টেড প্লেলিস্ট এখানে